চৌমুহনী মদন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চৌমুহনী মদন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি ও চৌমুহনী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক জহির উদ্দিন হারুন দাবি করেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গঠিত পূর্ববর্তী ম্যানেজিং কমিটি এবং সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক মো. মাহবুবুর রশীদ তারেক বিদ্যালয়টিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ
১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি একসময় নোয়াখালী অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাফল্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বর্তমান পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
জহির উদ্দিন হারুন বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরণ এবং তার ঘনিষ্ঠরা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে থেকে উন্নয়নের বদলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত ছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সর্বশেষ কমিটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম স্বপন এবং সাময়িক বহিষ্কৃত প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রশীদ তারেকের যোগসাজশে বিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিল ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
হারুনের দাবি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী কমিটির সময়ে এক মাসেই বিদ্যুৎ বিল তিন লাখ টাকা পর্যন্ত এসেছে, যা তিনি অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এছাড়া বিদ্যালয়ের স্থায়ী সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
প্রশাসনিক অবহেলা ও শিক্ষার ক্ষতি
সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে দেরিতে বিদ্যালয়ে আসতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত কমিটির ঘনিষ্ঠদের নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া ভর্তি বাণিজ্য, এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বেতন বঞ্চিত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বর্তমান কমিটির পরিবর্তনের দাবি
বর্তমান পরিচালনা কমিটির দাবি, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। জহির উদ্দিন হারুন বলেন, আগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল লাখ টাকায় পৌঁছাত, এখন তা কমে প্রায় ১০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, এখন নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের উপস্থিতি বেড়েছে এবং শিক্ষকরা সময়মতো বেতন পাচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বর্তমান কমিটি কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য বরকত উল্লা বুলু ও প্রশাসনের সহযোগিতায় ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক মো. মাহবুবুর রশীদ তারেক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সভাপতিকে ভুল তথ্য দিয়েছেন।”
অন্যদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরণ এবং সিরাজুল ইসলাম স্বপনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কায়েসুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে আমার কাছে ফাইল উপস্থাপন করা হলে আমি তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
এ সময় বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য, শিক্ষক প্রতিনিধি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত ছিলেন।

No comments