Header Ads

রাস্তার ধুলো থেকে মানুষের পাশে: মেসবাহ উল হক মিঠুর গল্প


ভোর পাঁচটা। শহরের অন্ধকার এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। রাস্তায় ভেজা মাটির গন্ধ, ধুলো, ডিজেলের ধোঁয়া—সব মিলে এক অদ্ভুত মিশ্রণ, যা মিঠুর জীবনের পরিচয়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বাইরে তাকালেন। রিকশার ঘণ্টি বাজছে, বাসের হর্নের আওয়াজ ভেসে আসছে, ফুটপাতে চায়ের দোকানের কড়াইয়ের শব্দ—সবই যেন শহরের প্রতিদিনের হৃদস্পন্দন। এই শব্দগুলো মিঠুর কাছে শুধু শব্দ নয়, এক পরিচিতি, এক জীবনধারা।

চুলে এখন সাদা রেখা, চোখে ক্লান্তির ছাপ। তবে মন এখনও দৃঢ়। গত রাতের রিপোর্ট—জেলার ভাঙা রাস্তা, মানুষের কষ্ট—তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। মনে পড়ে সেই বৃদ্ধা রিকশাওয়ালা, যিনি ভাঙা রিকশা ঠেলে চলার সময় কাঁদছিলেন। মিঠু তখন ক্যামেরা নামিয়ে সাহায্য করেছিলেন। বৃদ্ধা বলেছিলেন, “ভাই, তোমার মতো লোকও আছে?” মিঠু মাথা নত করেছিলেন—কারণ সত্যিই, অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু কাজ করা কঠিন।

সাংবাদিকতার শুরু: চ্যানেল ওয়ান

বিশের দশকে, চ্যানেল ওয়ানের অফিসে প্রথম পা রাখা দিনের কথা এখনও জীবন্ত। তরুণ মিঠু, চোখে স্বপ্ন, মনে উদ্যম। প্রথম রিপোর্ট—a minor road accident। রক্তাক্ত দেহ, কান্নারত পরিবার, ভাঙা গাড়ি।

সঙ্গে ছিলেন নোবিন, ক্যামেরাম্যান। সতর্ক, অভিজ্ঞ, সহমর্মী। নোবিন শিখিয়েছিলেন—ক্যামেরা শুধু চোখ নয়, মানুষের ভেতরের গল্পের দরজা। তাদের মধ্যে জন্ম হয় এক অদৃশ্য বন্ধুত্ব। ক্লান্তি আসে, হতাশা আসে, তবে থেমে যাওয়া যেন কোন বিকল্প নয়।

প্রথম দিনেই মিঠু বুঝলেন—সাংবাদিকতা শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, মানুষের কষ্টের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার নাম। দেখানো আর সাহায্য করার মধ্যে অসীম পার্থক্য রয়েছে।

জেলা প্রতিনিধি ও করেসপন্ডেন্ট

কয়েক বছর পর মিঠু হয়ে উঠেন দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস বাংলাদেশ–এর জেলা প্রতিনিধি। পাশাপাশি তিনি করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করেন UNB - United News of Bangladesh-এ।

দায়িত্ব বেড়েছে, চাপ বেড়েছে। সকালে প্রেস কনফারেন্স, দুপুরে ফিল্ড ভিজিট, বিকেলে রাজনৈতিক ইভেন্ট, রাতে রিপোর্ট লেখা। তবে রাস্তা তাকে ছাড়ে না।

একদিন স্কুলবাস উল্টে যায়। শিশুরা কাঁদছে, মা-বাবারা ছুটে আসছে। মিঠু দৌড়ে আহত শিশুকে উদ্ধার করেন। রক্তে শার্ট মাখামাখি। কেউ জিজ্ঞেস করে, "আপনি কে?"
মিঠু বলেন, "একজন মানুষ।"

রাতের প্রতিবেদনে তিনি শুধু তথ্য দেন না—শিশুর চোখের ভয়, মায়ের কান্না, মানুষের অসহায়ত্বও তুলে ধরেন। পাঠকের চোখেও আসে অশ্রু।

যানজট: রাস্তায় যুদ্ধ

শহরের যানজট মিঠুর কাছে আর বিরক্তির কারণ নয়। এটি এক অদৃশ্য যুদ্ধ, যেখানে মানুষের জীবন, সময় ও নিরাপত্তা সব ঝুঁকিতে।

এক বিকেল, অফিস থেকে ফেরার পথে দেখা যায়, রাস্তার মাঝখানে গাড়ির সারি। দূরে একটি অ্যাম্বুলেন্স থেমে আছে। ভিতরে রোগী—গুরুতর অবস্থায়। ড্রাইভাররা হর্ন বাজাচ্ছে, গালাগালি করছে, কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

মিঠু দ্রুত নামেন, হাতে হুইসেল। প্রথমে ভদ্রভাবে অনুরোধ করেন, "ভাই, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ খোলেন।" কেউ সাড়া দেয় না। তখন মিঠু হুইসেল বাজানো শুরু করেন।

ধীরে ধীরে কিছু যুবক এগিয়ে আসে। তারা সাহায্য করতে শুরু করে। মিঠু তাদের নির্দেশ দেন—গাড়ি সামনের দিকে সরান, দুই পাশে দাঁড়ান। রাস্তার ধুলো মিঠুর জুতো ভিজে গেছে, হাওয়া ঢেউ খেলছে। তবে তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।

দশ মিনিটের মধ্যেই রাস্তা খোলা। অ্যাম্বুলেন্স চলে যায়। পাশের চায়ের দোকানদার তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, "আপনি তো সংবাদিক, কেন এমন করেন?"

মিঠু ধীরে চুমুক চা নিয়ে বলেন,
"লিখা পরে করা যায়। কিন্তু জীবন বাঁচানো এখনই করতে হবে। আজ যদি কেউ অ্যাম্বুলেন্সে পৌঁছাতে না পারত, তবে সব লেখা, সব রিপোর্ট অকার্যকর হত।"

নোবিন, পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা ধরে, শুধু দেখেন না, ভাবেন—এই মুহূর্তে মিঠু কেবল সাংবাদিক নয়, শহরের মানুষের রক্ষক, একজন সামাজিক কর্মী।

পারিবারিক জীবন: নাসরিন ও মিপা

স্ত্রী নাসরিন প্রায়ই বলেন, "তুমি কি কখনও নিজের জন্য সময় বের করবে? ছেলেমেয়েরা তোমাকে চায়, আমি চাই।"
মিঠু চুপ থাকেন। ফোনে কেউ যে সময়ই হোক—প্রয়োজনে ছুটে যান।

একবার মেয়ের জ্বর। জরুরি প্রতিবেদনের কারণে বাইরে। ফোনে মেয়ের কান্না। মিঠু দৌড়ে বাড়ি ফিরেন। সারারাত পাশে বসে থাকেন। সকালে মেয়ের জিজ্ঞাসা—"বাবা, তুমি এসেছিলে?"
মিঠু বলেন, "হ্যাঁ মা, বাবা সবসময় পাশে আছে।"

নাসরিন চোখে অদৃশ্য কষ্ট রাখলেও দোষারোপ করেন না। মিঠু জানেন—পরিবারই তার শক্তি। সাংবাদিকতার চাপের মাঝে পারিবারিক ছোট আনন্দই তাকে টানে।

রাজনৈতিক কভারেজ ও দুর্নীতি

মিঠু প্রায়শই স্থানীয় রাজনীতি ও দুর্নীতির কভারেজ করেন। সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার—সব মানুষের ক্ষতি করে।

নোবিনের ক্যামেরার মাধ্যমে তিনি দেখান মানুষের চোখের ভয়, ক্ষোভ, ক্ষতি। নোবিন শুধু ক্যামেরাম্যান নয়, কখনও কখনও মিঠুর মানসিক সমর্থনও। তারা একে অপরকে বোঝে—ক্লান্তি, হতাশা, কিন্তু কখনও থেমে না যাওয়া।

সামাজিক কর্মকাণ্ড

মিঠু সাংবাদিকতা শেষ করে এখন নিজেকে পুরোপুরি সামাজিক কর্মী হিসেবে নিয়োজিত রাখেন।

  • বর্ষায় রাস্তার পানি জমলে যুবকদের নিয়ে ড্রেন পরিষ্কার
  • শীতে অসহায় মানুষের জন্য কম্বল বিতরণ
  • ঝগড়া, সংঘাত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিরসন
  • ছোট্ট ক্লিনিক, বৃদ্ধাশ্রম, শিশুদের জন্য খাবার ও ওষুধ বিতরণ

শহরের মানুষ তাকে চেনে। ভাড়ার বাসের চালক, ফুটপাতে চায়ের দোকানদার, পুলিশ, শিক্ষক—সবাই। কখনও তারা বুঝতে পারে, শহরের মানুষের জন্য শুধু কলম নয়, হাতের কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একাকীত্ব ও আত্মমনের কথা

রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকান। মনে পড়ে আজকের দিনের ঘটনা। কেউ তাকে পাগল বলে, কেউ বলে—“এত করো, কেউ চেনে না।”

মিঠু জানেন—নাম বড় হবে না, পুরস্কার কম। কিন্তু শিশুটি বেঁচে গেছে, বৃদ্ধা রিকশাওয়ালা আবার কাজ করছে, এলাকাটি শান্তিতে আছে—এটাই তার পুরস্কার।

শেষ কথা

মিঠু ক্লান্ত, কিন্তু থেমে না। ব্যথা পান, কিন্তু থামেন না। একা, কিন্তু অসহায় নয়।

"মানুষ যখন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন পৃথিবী একটু হলেও সুন্দর হয়।"

মিঠুর গল্প শেষ হয়নি। প্রতিদিন, প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি মানুষের চোখে—
সেই গল্প আবার লেখা হয়। ধুলোয়, ঘামে, কান্নায়, ভালোবাসায়।

No comments

Powered by Blogger.