যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, "আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে"
ওয়াশিংটন/তেহরান | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার কঠোরতম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ইরান যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে তবে "আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না"।
এই চরম বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ট্রাম্প মঙ্গলবার সকালে তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক পোস্টে এই হুমকি দেন। তিনি লেখেন, "আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না। আমি চাই না যে এমনটা হোক, কিন্তু সম্ভবত তা-ই ঘটবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা আজ রাতেই জানতে পারব, এটি বিশ্বের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।"
হরমুজ প্রণালী খোলার দাবি, লক্ষ্যে খারগ দ্বীপ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই চরম হুঁশিয়ারির মূল দাবি হলো—ইরান যেন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে ইরান এই প্রণালীর মাধ্যমে তেল পরিবহন কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়; ফলে এর বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে ঐতিহাসিক ধস নেমেছে এবং জ্বালানি মূল্য আকাশছোঁয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের ঠিক আগেই মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খারগ দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
এছাড়া মঙ্গলবার ইরানের দুটি সেতু এবং একটি রেল স্টেশনেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
"মানব শৃঙ্খল গড়ে রক্ষা করুন": ইরানের পাল্টা আহ্বান
ট্রাম্পের এই হুমকির প্রেক্ষিতে ইরানি কর্মকর্তারা দেশের তরুণদের বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষায় "মানব শৃঙ্খল" গড়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে তাঁসহ ১৪ মিলিয়ন মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেছেন।
ইরান মার্কিন প্রস্তাবিত চুক্তির শর্তাবলী প্রত্যাখ্যান করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
যদিও কিছু কূটনীতিক বলছেন যে আলোচনা এখনও চলছে, কিন্তু সময় অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে এসেছে।
শেষ ডেডলাইন: ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টা
ট্রাম্প ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার ডেডলাইন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মঙ্গলবার তিনি ইঙ্গিত দেন যে ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টার এই ডেডলাইনই "চূড়ান্ত"।
তিনি আগেই হুমকি দিয়েছিলেন যে, যদি ইরান হরমুজ প্রণালী না খোলে, তবে তিনি ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেবেন।
একটি উত্তেজিত ইস্টার বার্তায় তিনি রবিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, "ওই পাগল বাস্টার্ডরা, হরমুজ প্রণালী খোলো, নাহলে তোমরা নরকে বাস করবে।"
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা
বিশ্বনেতারা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ট্রাম্প যে ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো উভয় পক্ষকে সংযম বজায় রাখতে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে আহ্বান জানিয়েছে।
পটভূমি: ২০২৫-২০২৬ সংঘাতের ধারাবাহিকতা
বর্তমান সংকটের মূল শুরু ২০২৫ সালের জুন মাসে, যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এরপর থেকে উত্তেজনা কমেনি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের নেতৃত্ব, পারমাণবিক সুবিধা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে বিমান হামলা চালায়।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য নির্দেশনা
বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে ইরান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের, সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো ২৪ ঘণ্টা হটলাইন সেবা চালু রেখেছে।
পরবর্তীতে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে:
১. কূটনৈতিক সমাধান: শেষ মুহূর্তে কোনো মধ্যস্থতাকারী দেশের (যেমন কাতার, ওমান বা তুরস্ক) প্রচেষ্টায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হতে পারে।
২. সামরিক সংঘাত বৃদ্ধি: যদি চুক্তি না হয়, তবে ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী ইরানের অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্ববাসী এখন উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে—ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টার পর কী ঘটে। ট্রাম্প নিজেই তার বার্তায় বলেছেন, "হয়তো আজ রাতেই কিছু বিপ্লবীভাবে অসাধারণ ঘটতে পারে।"
কিন্তু সেই "অসাধারণ" ঘটনাটি হবে শান্তির নাকি ধ্বংসের, তাই এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র: সিএনবিসি, পিবিএস নিউজআওয়ার, আল জাজিরা, এএফপি

No comments