যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার পর উত্তপ্ত উপসাগর: ইরানের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব পাস
ইরানের প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং ভারতসহ বিশ্বের প্রায় ১৩৫টি দেশ এতে সমর্থন জানায়। এতে পারস্য উপসাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের ওপর ইরানের সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরানকে অবিলম্বে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান—এই দেশগুলোর বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো ইরানি হুমকি বা পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
এই প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে ১৩–০ ভোটে পাস হয়। তবে স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত থাকে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত উপসাগরীয় অঞ্চল
জাতিসংঘে বাহরাইনের স্থায়ী প্রতিনিধি জামাল ফারিস আলরোয়াই বলেন, এই ভোট উপসাগরীয় অঞ্চলের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতিফলন।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হওয়ায় পারস্য উপসাগর অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন।
‘স্থায়ী কলঙ্ক’ বলছে ইরান
প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি। তিনি এই সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে একটি “স্থায়ী কলঙ্ক” হিসেবে আখ্যা দেন।
ইরাভানির অভিযোগ, প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ একতরফা এবং এতে প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ উপেক্ষা করা হয়েছে।
তার মতে, নিরাপত্তা পরিষদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে পরিষদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যুদ্ধের সূচনা: যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা
ইরানের দাবি অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়, যার মধ্য দিয়েই সংঘাতের সূচনা হয়।
তেহরানের অভিযোগ, ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বহু সাধারণ নাগরিক নিহত হন।
এই ঘটনার জবাবে ইরান ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস বলেন, ইরানের আক্রমণাত্মক কৌশল শেষ পর্যন্ত তাদেরই বিপক্ষে গেছে।
রাশিয়া ও চীনের আপত্তি
যদিও প্রস্তাবটি পাস হয়েছে, তবু রাশিয়া ও চীন এতে সরাসরি সমর্থন দেয়নি।
চীনের প্রতিনিধি ফু কং বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব অবশ্যই সম্মান করা উচিত, তবে প্রস্তাবটিতে সংঘাতের মূল কারণ ও পূর্ণ চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিনিধি ভাসিলি নেবেনজিয়া এই প্রস্তাবকে “পক্ষপাতদুষ্ট ও একতরফা” বলে আখ্যা দেন।
রাশিয়ার বিকল্প প্রস্তাব বাতিল
পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে একটি বিকল্প খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করে। সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং সব পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।
তবে ভোটাভুটিতে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় রাশিয়ার প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।
এই প্রস্তাবের পক্ষে চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া ও সোমালিয়া ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও লাটভিয়া বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ৯টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

No comments