ফার্সি নববর্ষ নওরোজের আগেই তেহরানে ইসরায়েলের হামলা, উদ্বেগের মধ্যেই কাটছে ইরানের প্রাচীন উৎসব
ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ—হাজার বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব শুরুর আগেই রাজধানী তেহরানসহ ইরানের একাধিক এলাকায় হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। নওরোজের আনন্দঘন পরিবেশের বদলে এবার ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে শঙ্কা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার ছায়া।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে এবং কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী নুর অঞ্চলে একযোগে হামলা চালাচ্ছে। আইডিএফের দাবি, ইরানের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করেই এই বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, হামলা শুধু সামরিক এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তেহরানের বেশ কিছু আবাসিক এলাকাতেও কামানের গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, রাতের আকাশে বিস্ফোরণের লাল আভা এবং শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সাইরেনের শব্দে রাতভর চাঞ্চল্য বিরাজ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথমে ঘটনার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে উপস্থাপন করলেও পরে তারা স্বীকার করেছে যে রাজধানীর আশপাশের এলাকায় ‘সক্রিয় বিমানবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ সক্রিয় করা হয়েছে। তবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি পরিসংখ্যান জানানো হয়নি।
নওরোজ: উৎসবের মধ্যদিয়ে উদ্বেগ
নওরোজ কেবল একটি নববর্ষের অনুষ্ঠানমাত্র নয়; এটি ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি উৎসব। পারস্য সাম্রাজ্যের আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে বসন্তের আগমনে প্রকৃতি ও জীবনের পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ইরানিরা এই দিনটি উদযাপন করে আসছে। ইরানের পাশাপাশি আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত পারস্য ভাষাভাষী মানুষরা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নওরোজ পালন করেন।
নওরোজের আগমণি উৎসবের অংশ হিসেবে ঘরদোর পরিষ্কার, নতুন জামাকাপড় কেনা, হাফত সিন নামক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রথা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটে এবারের নওরোজ যেন অন্য রূপ নিয়েছে।
তেহরানের বাসিন্দা ফারজানে রহমানী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের বাড়িতে আজ হাফত সিন সাজানোর কথা ছিল। কিন্তু রাতের হামলার পর সবাই এতটাই আতঙ্কিত যে উৎসবের কোনো পরিবারই আর নেই। শুধু আমরা নয়, পাশের বাড়িতেও সবাই জানালা বন্ধ করে বসে আছে।”
আরেক বাসিন্দা রেজা কারিমি জানান, “এটা আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখন আমরা ভয় পাচ্ছি যে, আগামী দিনগুলোতে আরও বড় কিছু ঘটতে পারে। নতুন বছরের শুরুতেই এই অনিশ্চয়তা আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শঙ্কিত করে তুলেছে।”
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরেই চরমে পৌঁছেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে একাধিক রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। যদিও ইসরায়েল সরাসরি এসব হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে গোয়েন্দা সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে ইসরায়েল ইরানের ভেতরে সক্রিয় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
নওরোজের আগে এই হামলার সময় নির্বাচনকে অনেকে প্রতীকী হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জাতীয় গর্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত এই সময়ে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল ইরানের জনগণের মধ্যে মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়েও এই হামলা চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ ও বেশ কয়েকটি দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তৎক্ষণাৎ উত্তেজনা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছাড়া কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করা হয়নি।
পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে
বর্তমানে তেহরানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এদিকে তেহরানের আকাশসীমায় সামরিক টহল বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোর আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
নওরোজের আনুষ্ঠানিক ছুটির দিনগুলোতে সাধারণত ইরানের রাস্তাঘাট, পার্ক ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু এবার সরকারি উদ্যোগে উৎসবের অনুষ্ঠান অনেকটাই সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে কড়া নজরদারি জারি করা হয়েছে, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা এড়ানো যায়।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই দুর্বল। এর ওপর যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তেল রফতানি, বাণিজ্য ও মুদ্রাবিনিময় আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শেষ কথা
হাজার বছরের প্রাচীন ফার্সি নববর্ষ নওরোজ—যার মূল দর্শন হলো নতুন করে শুরু, মিলন ও প্রকৃতির পুনর্জন্ম। কিন্তু এবার এই উৎসবের প্রাক্কালে ইসরায়েলের হামলা যেন ইরানের জনগণের মনে ভিন্ন এক বার্তা দিয়ে গেল। আনন্দের বদলে শঙ্কা, আর উৎসবের বদলে যুদ্ধের ছায়া—এমন এক নওরোজ কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক উদযাপনের অধিকার।
আগামী কয়েক দিন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা আরও চরমে ওঠে কি না, তা নিয়ে পুরো বিশ্ব নজর রাখছে। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইরানের সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছে—শান্তির নতুন প্রভাত তাদের জীবনে ফিরে আসুক, নওরোজের প্রতীকী বার্তা যেন শুধু বইয়ের পাতায় না থেকে বাস্তবেও ধরা দেয়।
No comments